মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলা প্রশাসনের পটভূমি

পটুয়াখালী জেলার ইতিহাসের সঙ্গে বাখেরগঞ্জ জেলার ইতিহাসের মিল রয়েছে। পটুয়াখালী একদা বরিশাল জেলার একটি মহকুমা ছিল। বস্ত্ততঃ পটুয়াখালী ও বাখেরগঞ্জের ইতিহাস একারণেই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাখেরগঞ্জ-পটুয়াখালী অঞ্চলের ভূ-ত্বকের গঠন সম্পর্কে দুটি তত্ত্ব আছে। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী এ এলাকা একদা ছিল সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী অভ্যন্তরীণ সমুদ্র বা লেগুন। ধীরে ধীরে গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পলি জমে যাওয়ায় সাগর ভরাট হয়ে যায়। অন্য তত্ত্বঅনুযায়ী, দুসূর অথীতে বর্তমান পটুয়াখালী-বাখেরগঞ্জের অধিকাংশ স্থান সুগন্ধানামে একটি বিশাল নদীবক্ষ ছিল। যদিও পন্ডিতগণের স্থির বিশ্বাস যে, পটুয়াখালীর ভূ-ভাগ পলি সৃষ্ট তথাপি তাঁরা বৈদিক যুগে এই পরি সৃষ্টির বিষয়সন্দেহ মুক্ত নন। তবে পটুয়াখালী -বাখেরগঞ্জ এলাকা যে সাগর বক্ষ থেকে উঠেছে তার ইঙ্গিত পৌরাণিক যুগেও পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের আদি অধিবাসীদের ন্যায় পটুয়াখালীর আদি অধিবাসীগণও আধুনিককালে জাতি ও অন্যান্যদের পূর্বপুরুষ ছিল। এদেরকে অষ্ট্রো এশিয়াটিক বা অষ্ট্রিক জাতি বলা হয়। কালক্রমে অনেক দল বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করে। কথিত আছে যে, ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে বর্মীরা আরাকান জয় করলে ৩০ হাজার মঘ চট্রগ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করে। এদেরই একটি দল পটুয়াখালীর সুন্দরবন এলাকায় বসতি স্থাপনকরে। কৃষি সম্প্রসারণের জন্যে ইংরেজ অফিসারগণই মঘদেরকে বসতি স্থাপন করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন, এরূপ প্রমাণও পাওয়া যায়। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের আদম শুমারী অনুযায়ী পটুয়াখালী জেলায় ৪০৬৬ জন মঘ ছিল।

গুপ্ত যুগেই পটুয়াখালীর রাজনৈতিক ইতিহাসের সূচনা। এলাহাবাদ গুপ্ত লিপি থেকে জানা যায় যে, সমতট বা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা সমুদ্র গুপ্তের (৩৪০-৩৮০ খ্রঃ) সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। গুপ্ত বংশের পতনের পরে ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বাংলাদেশে দুটো স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়। ৬ষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যখন পরবর্তী গুপ্ত রাজারা গৌড় ও মগধ দখল করেন তখন দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় খড়গ রাজবংশের উদ্ভব হয়। অতি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত খড়গ বংশ থেকে বর্ম বংশ পর্যন্তইতিহাস ছিল অজ্ঞাত। ময়নামতি লালমাই অঞ্চলে খননকার্যের ফলে যে সকল তথ্য পাওয়া গিয়েছে তাতে অষ্টম শতাব্দী থেকে সমতটে ইতিহাস নির্ধারণ করা সম্ভব। এসব তথ্যে জানা যায় যে, খড়গদের পরে দক্ষিণপূর্ব বাংলায় অষ্টমশতাব্দীর প্রারম্ভে দেবগণ ক্ষমতায় আসেন। দশম শতাব্দীর শুরুতে কান্তিদেব ও তাঁর বংশধরগণের পরে চন্দ্রবশীয়গণ দক্ষিণ পূর্ব বাংলা অধিকার করেন। পটুয়াখালীও এদের দখলে ছিল। এ অঞ্চলে পাল রাজত্ব ছিল স্বল্পকাল স্থায়ী। একাদশ শতাব্দীরশেষ ভাগে কৈবর্ত বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে বর্গগণ দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় স্বাধীনরাজত্ব স্থাপন করেন। বর্ম রাজার বৈ...বপন্থী ছিলেন। পটুয়াখালী অঞ্চল বর্মঅধিকারে ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগেই বর্ম রাজত্ব শেষ হয়ে যায় এবং সমতটরাজ্যে সেন বংশের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়। সুন্দরবন ও তার সন্নিহিত এলাকা পটুয়াখালী সেন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চর্তুদশ শতাব্দীর শুরুতে মুসলিম রাজ্য সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। মুসলমানদের এইশক্তি বৃদ্ধির সময় পটুয়াখালী-বাখেরগঞ্জ অঞ্চলে চন্দ্রদ্বীপ নামে একটিক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। রাজা দনুজ রায় এ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রায় পরিবার প্রশমে মেহেন্দীগঞ্জে এবং পরে পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানাধীন কচুয়াতে বসবাস করেন। পটুয়াখালীতে মুসলিম রাজত্ব সুলতান রুকুনুদ্দিন বারবাকশাহের (১৪৫৯-১৪৭৪খ্রঃ) রাজত্বকালেই ১৪৬৫ খৃষ্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল। দক্ষিণপূর্ব বাংলায় অনেক পূর্ব থেকেই আরাকানী মঘদের যাতায়াত ছিল। মঘেরা পটুয়াখালী ও সুন্দরবন অঞ্চলে ভীষণ আতংক সৃষ্টি করেছিল এবং লোকজনকে দেশত্যাগকরতে বাধ্য করেছিল। একমাত্র মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরেই মঘ উপদ্রব ভালরুপে দূরীভূত হয়েছিল। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগীজরাই বর্স প্রথম বাখেরগঞ্জ-পটুয়াখালী অঞ্চলে বানিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৬১১ খ্রষ্টাব্দথেকে পটুয়াখালী এলাকা মুঘল অধিকারে আসে। চন্দ্রদ্বীপ রাজাগণ পটুয়াখালী বাখেরগঞ্জ অঞ্চলে শাসন করলেও তাঁরা মুঘল বশ্যতা স্বীকার করতেন।

বর্তমানপটুয়াখালী অঞ্চল প্রথমদিকেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দৃষ্টি আকর্ষণকরে।  ১৭৫৭ খ্রষ্টাব্দে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের কারণে সাবেক বাংলাপ্রদেশের (বিহার ও উড়িষ্যা সহ) অন্যান্য অংশের ন্যায় বর্তমান পটুয়াখালী অঞ্চলও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনাধীনে আসে। বিদেশী শাসনের প্রথমবাছরগুলোতে পটুয়াখালী বাখেরগঞ্জ এলাকা ঢাকা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৮১খৃষ্টাব্দে ম্যাজিষ্ট্রেটের ক্ষমতাসহ একজন বেসামরিক বিচারক নিয়োগ করা হয়।তদানীন্তন বাখরগঞ্জ জেলার দক্ষিণাঞ্চলের বিরাট অংশ নিয়ে ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে পটুয়াখালী মহকুমা গঠন করা হয়। ১৯৬৯ সালে পটুয়াখালী জেলায় রুপান্তরিত হয়। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চঅ বিধায় প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। ১৯৭০সালের ঘূর্ণিঝড় এই অঞ্চলের অতীতের সকল প্রলয়ংকরী ঝড়ের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বিশেষভাবে, পটুয়াখালী জেলাতেই জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে সর্বাধিক।

১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গছিত হয়। পটুয়াখালীতে মুসলিম লীগের শাখা কবেগঠিত হয়েছিল। তা জানা যায় না। এ,কে ফজলুল হক এবং বাখেরগঞ্জ জেলার অন্যান্যবিখ্যাত মুসলমান নেতাগণ গোড়া থেকেই মুসলিমলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।পাকিস্তান অংশ হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট প্রতিষ্ঠিত হলে বাখেরগঞ্জ জেলার অংশ হিসেবে এ জেলা তার অন্তর্ভুক্ত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ জেলার ভূমিকা যেম ছিল গৌরবময়, তেমনি অনন্য। পাকবাহিনীর মামলার বিরুদ্ধে জেলার অধিবাসীরা অন্যান্য জেলার সংগ্রামী জনসাধারণের মতই প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলো শহরে-গ্রামে-গঞ্জে, সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধেও প্রবল পরাক্রমের সঙ্গে হামলাকারীদেও বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তাদেরও প্রতিরোধ সমূলে ধ্বংস করার জন্য পাকবাহিনী পটুয়াখালী শহর আক্রমণ করে। ১৯৭১ সালে এ জেলার ভিন্ন শহর, গ্রাম এবং গঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদেও সঙ্গে পাকবাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। পটুয়াখালী, পাথরঘাটা এবং গলাচিপাসহ এ জেলারবিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদেও সঙ্গে পাকবাহিনীর যুদ্ধ এক গৌরবময় ইতিহাসসৃষ্টি করে।

এ জেলার অধিবাসীদের অধিকাংশই মুসলমান। এছাড়া হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধসম্প্রদায়ের লোকেরাও এখানে বসবাস করে। এ জেলার অন্তর্গত বঙ্গোপসাগরের উপকুলী এলাকায় রাখাইন উপজাতি বাস করে। এরা আরাকান বংশীয় এবং ধর্মে বৌদ্ধ। পোশাক-পরিচ্ছদে, খাদ্যাভাসে, বাসস্থান নির্মাণে, ভাষায় নিজেদের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জীবনধারা ও ঐতিহ্যেও অনুসারী। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতই এ জেলায় বাগদান ও বিয়ের ব্যাপারে একই আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বাসগৃহই দো-চলা ও চৌচালা। বাঁশ ও সুপারী কাঠ দিয়ে এসব ঘরের মাঠামো তৈরী করা হয় এবং গোলপাতা, খড় অথবা ঘরের চালে ঢেউটিন ব্যবহার করে থাকে। সাগরঘেরা অসংখ্যা নদী-নালা, খালবিল পরিবেষ্টিত পটুয়াখালীর মানুষ কঠোর পরিশ্রমী, সাহসী ও সংগ্রামী। নদী সাগরে এদের বেড়ে উঠা। বৈরী ও প্রতিকূলপরিবেশে জোয়ার-ভাটা সাথে গ্রন্থিত তাদের জীবন।

এজেলায় অধিবাসীদের উপর পীরদের প্রভাব খুবই বেশী। অধিকাংশ গ্রামবাসীই কোন নাকোন পীরের মুরীদ। অধিবাসীরা সাধারণভাবে ধর্মভীরু। তাদের সংগীদের মধ্যেধর্মীয় আচারাদিও ছোঁয়া পাওয়া যায়। প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন-জারীগান, সারীগান, কবিগান, রুপবান, যাত্রাগান, ভাটিয়ালী, রাখালী, মুর্শীদিগানপ্রভৃতি এখানে খুবই পরিচিত। রাখাইন সম্প্রদায়ের পেগু নাচ অনেকেই পছন্দ করে। এখানে রাখাইন তাঁত শিল্পে রাখাইনদের নিজস্ব ঢংয়ের পোশাক, জামদানী তাঁত শিল্পে জামদানী শাড়ী তৈয়ার হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে সোলার প্যানেল ও সার্কিটের সাহায্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

ছবি